# অবশেষে খোঁজ মিলল সাবেক পাইলটের! নিখোঁজের পর তুরাগ নদে মিলল তাহসিফের মরদেহ
নিখোঁজ হওয়ার পর অবশেষে খোঁজ মিলেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির। তবে তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিবারের জন্য সেই খবর ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর রাজধানীর উত্তরা-সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, নিখোঁজ হওয়ার আগে শেষ রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এবং তিনি কী পরিস্থিতিতে নদে পৌঁছালেন—এসব প্রশ্ন ঘিরে এখন তদন্ত চলছে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসবেন। কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তিনি বাসায় ফেরেননি। পরদিন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে। এতে পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
## বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বের হয়েছিলেন তাহসিফ
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ নামের এক পরিচিত ছোট ভাই তাহসিফের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন বলে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ।
রাত গভীর হওয়ার পরও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফ তাঁর মাকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁর খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ শুরু হয়। কিন্তু কোথাও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হয়।
## তুরাগ নদ থেকে যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ
২৮ অক্টোবর বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর টঙ্গী নৌ-পুলিশের সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় যান। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নদে ভাসমান অবস্থায় একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রথমে মরদেহটির পরিচয় নিশ্চিত ছিল না। পরে সঙ্গে থাকা মুঠোফোনের সূত্র ধরে এবং স্বজনদের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। জানা যায়, তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি।
পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তবে এসব তথ্য দিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যায় না। সে জন্য ময়নাতদন্ত ও তদন্তের অন্যান্য ফল গুরুত্বপূর্ণ।
## শেষ রাতে কী ঘটেছিল?
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁর বন্ধু দ্বীপের বক্তব্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বীপের সঙ্গে তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামত এবং একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
দ্বীপের প্রাথমিক বর্ণনা অনুযায়ী, দুজন একসঙ্গে সময় কাটানোর পর আলাদা হয়ে যান। তবে পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে নদসংলগ্ন এলাকায় তাঁদের উপস্থিতি এবং ধাওয়া করার দাবি উঠে আসে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এসব বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য থাকায় তদন্তকারীরা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন।
কোন বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের প্রমাণ মেলে, তাঁরা কেন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের বিষয়। তাই কোনো একটি বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
## তদন্তের আওতায় বন্ধুর বক্তব্য
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়া ব্যক্তি দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় বলে ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
তদন্তকারীরা ঘটনার আগের রাতের চলাফেরা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করছেন। তাহসিফের মোটরসাইকেল নিখোঁজ থাকার বিষয়টিও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। ফলে মোটরসাইকেলটির অবস্থান এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের অংশ হতে পারে।
তবে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া মানেই তিনি অপরাধ করেছেন, এমন নয়। প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের জন্য তদন্তে পাওয়া প্রমাণ এবং আইনগত প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
## সাবেক এই কর্মকর্তাকে নিয়ে কেন আলোচনা?
তাহসিফ সাউরি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শৃঙ্খলাজনিত কারণে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি হারান। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণের সঙ্গে তাহসিফের সম্পর্ক ছিল। তবে এ দাবির সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাই এ ধরনের দাবি প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
## এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। তিনি কীভাবে তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছেছিলেন? শেষ রাতে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল? নদে পড়ার পেছনে দুর্ঘটনা, অন্য কোনো ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? তাঁর মোটরসাইকেল কোথায় রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে তদন্তকারীদের ঘটনাস্থলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং ময়নাতদন্তের ফল মিলিয়ে দেখতে হবে। পরিবারের জন্যও প্রকৃত ঘটনা জানা এবং ন্যায়বিচার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
## শেষ কথা
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং শেষ রাতে কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
বন্ধু দ্বীপের বক্তব্য, নিখোঁজ মোটরসাইকেল এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে। তাই গুজব বা অনুমানের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তদন্তের ফলের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।
**তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিটি তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা এবং তাঁর পরিবারকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।**
