“হিজড়াদের কাছে আমার মা সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে বলেছিলেন, আমার বাচ্চাটারে নিও না।” 
গোপালগঞ্জের এক বস্তি থেকে তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাস। গল্পটা সিনেমাকেও হার মানায়, কিন্তু এটা কোনো সিনেমা নয়। এটা বাংলাদেশের ৩৫তম বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারের ফার্স্ট সেক্রেটারি ওয়ালিদ ইসলাম-এর জীবনের বাস্তব ঘটনা।
যিনি শুধু একজন সফল কূটনীতিকই নন, বরং বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের ক্যাডার অফিসার এবং বিশ্বের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কূটনীতিক!
গত বছর তেহরানে এক শীতের রাতে একটা ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ ৩৪ বছরের লুকিয়ে রাখা পরিচয়টা দুনিয়ার সামনে আনেন তিনি।
লিখেছিলেন, “নিজের সঙ্গে নিজে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত আমি।”
ওয়ালিদের এই জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না।
ছোটবেলায় হিজড়া পল্লীর মানুষ যখন তাকে নিতে আসতো, বাবা-মা ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। মায়ের সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন। পুরো পরিবার গোপালগঞ্জ ছেড়ে যশোরে চলে গিয়েছিল শুধু ছেলেকে সমাজের কটূক্তি থেকে বাঁচাতে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে পড়ালেখা শেষ করে ৩৫তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডার হন। কিন্তু বিসিএসের ফরমে তখন ‘হিজড়া’ বা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ লেখার কোনো ঘরই ছিল না, পুরুষ পরিচয়েই পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।
একসময় ভালোবেসেছিলেন একজনকে। বিয়ে ঠিক হওয়ায় ৩টা বড় অপারেশন করে নারী হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। ৩৬ দিন বিছানায় থাকার পর সেই মানুষটা বলে দিলো, “তুমি তো ট্রান্সজেন্ডার, তোমাকে বিয়ে করা যায় না!” 
ট্রেনিং পিরিয়ড থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র সবখানেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আর মানুষের বাঁকা চাহনি তাড়া করেছে তাকে। অথচ আজ তিনি তেহরানে বসে বুক ফুলিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নিজের ফ্ল্যাটটাকে বানিয়েছেন এক টুকরো বাংলাদেশ।
তাঁর সেই বিখ্যাত লাইনটা সবার মনে গেঁথে থাকার মতো,”তোমাদের পথে ফুল ছড়ানো ছিল, আমার পথে ছিল জ্বলন্ত কয়লা।”
স্যালুট ওয়ালিদ ইসলাম! লিঙ্গ পরিচয় নয়, মানুষকে বড় করে তার মেধা, যোগ্যতা আর লড়াই করার ক্ষমতা। পরিচয় প্রকাশের পর তিনি বলেছিলেন, এখন নাকি তাঁর খুব হালকা লাগছে। এই হালকা লাগাটাই হোক পৃথিবীর সব লড়াকু মানুষের শক্তি। 
