ফেনীর ফুলগাজীতে ঋণের কিস্তির টাকা জোগাড় করতে চুরির উদ্দেশ্যে এক গৃহবধূর ঘরে ঢোকার অভিযোগ উঠেছে এক যুবকের বিরুদ্ধে। পরে ওই বাড়ি থেকে গৃহবধূর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নেমে অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তার করে র্যাব। প্রাথমিকভাবে কিস্তির টাকা জোগাড়ের জন্যই তিনি চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন বলে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
নিহত ওই গৃহবধূর নাম বিবি কুলসুম কাজল। তিনি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আমজাদহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ তালবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং কুয়েতপ্রবাসী নুরুল আমিনের স্ত্রী ছিলেন। ঘটনার পর তাঁর মরদেহ নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মো. আরিফুল ইসলাম নামের ৩১ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি একই এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ছিলেন। তদন্তে তাঁর সঙ্গে নিহত নারীর আত্মীয়তার সম্পর্কও থাকার কথা উঠে এসেছে।
র্যাব জানায়, আরিফুল একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণের জন্য তাঁকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে না পেরে তিনি চুরির পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
ঘটনার রাতে গৃহবধূ কুলসুম নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে টিনের চাল কেটে মুখোশ পরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন আরিফুল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঘরে থাকা টাকা বা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করা।
তবে ঘরে ঢোকার পর কুলসুমের ঘুম ভেঙে যায়। তখন দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয় বলে র্যাব জানিয়েছে। একপর্যায়ে ওই গৃহবধূকে আঘাত করা হয় এবং তাঁর হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
ঘটনার পর স্থানীয়রা বাড়ির টিনের চাল কাটার বিষয়টি দেখতে পান। পরে ঘরে প্রবেশ করে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নিহতের বাবা বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় হত্যা মামলা করেন।
এরপর র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় আরিফুলের নাকের নিচে আঁচড়ের দাগ দেখতে পান তদন্তকারীরা। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে র্যাবের সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
র্যাবের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আরিফুল হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তবে আদালতে অভিযোগের বিচার ও চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা যায় না।
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—একটি ঋণের কিস্তির টাকা জোগাড়ের চাপ কীভাবে একজনকে অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, আরিফুলের ওপর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চাপ ছিল এবং সেই টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ পরিচিত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একজন নারী নিজের ঘরে এমন হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সবশেষে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নোট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে “কিস্তির টাকা আদায় করতে গিয়ে দিনে দুপুরে গৃহবধূর ঘরে ঢুকে…”—এভাবে উপস্থাপন করা হলেও যাচাই করা প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এই বর্ণনা পুরোপুরি মেলে না। তাই প্রকাশের ক্ষেত্রে যাচাই করা তথ্য ব্যবহার করাই নিরাপদ।
