পুত্রসন্তানের আশায় একের পর এক সন্তান নেওয়ার পর ঘর আলো করে জন্ম নেয় নয় কন্যাসন্তান। শুরুতে হয়তো পরিবারটির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কন্যারাই হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও গর্বের কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমনই একটি গল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভাইরাল হওয়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নয় মেয়ের মধ্যে একজন নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের জন্য বিশেষ সম্মান বয়ে এনেছেন।
ভাইরাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুত্রসন্তানের আশায় পরিবারটিতে একে একে নয়টি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। প্রতিবার কন্যাসন্তান জন্মের পর পরিবারের প্রত্যাশা হয়তো আরও একটি সন্তানের দিকে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নয়জনই মেয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিস্থিতিতে আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের নানা মন্তব্য ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে পরিবারটিকে—এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
তবে সময়ই অনেক সময় মানুষের ধারণা বদলে দেয়। মেয়েরা বড় হতে থাকে। তাদের কেউ পড়াশোনায় ভালো করে, কেউ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, কেউ আবার পরিবারের নানা দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ভাইরাল গল্পে নয় মেয়ের মধ্যে একজনের বিশেষ সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী ছিলেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
একসময় যে পরিবার হয়তো ছেলে সন্তানের অপেক্ষায় ছিল, সেই পরিবারেই মেয়ের সাফল্য আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটির অর্জন শুধু তার নিজের নয়, বরং পুরো পরিবারের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে—এমন একটি বার্তাই ভাইরাল প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্তান ছেলে না মেয়ে—তার চেয়ে বড় বিষয় হলো সন্তানকে কীভাবে মানুষ করা হচ্ছে। একটি শিশুকে যদি ভালো শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুযোগ এবং পরিবারের ভালোবাসা দেওয়া যায়, তাহলে সে নিজের যোগ্যতায় অনেক দূর যেতে পারে। কন্যাসন্তানকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সমাজে এখনো অনেক পরিবারে পুত্রসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা দেখা যায়। এই মানসিকতার কারণে কখনো কখনো পরিবারগুলো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন সামাজিক গবেষণা ও প্রতিবেদনেও দেখা যায়, পুত্রসন্তানের প্রত্যাশা অনেক পরিবারকে বেশি সন্তান নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অথচ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ছেলে কিংবা মেয়ে—দুজনেরই সমানভাবে শিক্ষা, ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ প্রয়োজন। কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাকে পরিবারের সমান সদস্য ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে মেয়েদের সাফল্যের অসংখ্য উদাহরণ এখন চারপাশে রয়েছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, গবেষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশায় নারীরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। অনেক পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে শেষ পর্যন্ত মেয়েরাই দাঁড়াচ্ছেন। ফলে শুধু ছেলে সন্তানই বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এমন ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই।
ভাইরাল হওয়া এই নির্দিষ্ট গল্পটির ক্ষেত্রে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মেয়েটির নাম, পরিবারটির বিস্তারিত পরিচয় কিংবা তার সাফল্যের নির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত কোনো তথ্যকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে নির্ভরযোগ্য উৎসে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে ঘটনাটির মূল বার্তাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ—সন্তানকে তার লিঙ্গ দিয়ে বিচার না করে তার যোগ্যতা ও মানবিক গুণ দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। যে সন্তানকে একসময় ‘মেয়ে’ বলে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই সন্তানই একদিন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় গর্ব হয়ে উঠতে পারে।
নয় কন্যাসন্তানের এই ভাইরাল গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের দীর্ঘদিনের একটি মানসিকতার দিকেও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। পুত্রসন্তানের আশায় বারবার সন্তান নেওয়ার বদলে প্রতিটি সন্তানকে সমান ভালোবাসা, শিক্ষা ও সুযোগ দেওয়াই হতে পারে একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
শেষ পর্যন্ত সন্তানের পরিচয় ছেলে কিংবা মেয়ে নয়—তার পরিচয় হওয়া উচিত একজন ভালো মানুষ হিসেবে। আর সেই মানুষটি যদি নিজের পরিশ্রমে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, তাহলে তার চেয়ে বড় গর্ব একটি পরিবারের জন্য আর কী হতে পারে?
