জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। তবে দুদক জানিয়েছে, অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন যৌথ বিবৃতিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ১৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তারা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ সামনে আনা ঠিক নয়।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের মধ্যে বিদেশে সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি।
এরই মধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল অর্থ পাচার এবং সেখানে সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অর্থের পরিমাণ ও অভিযোগের অন্যান্য বিষয় এখনো তদন্তাধীন।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ১৩ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তিনি এসব অভিযোগ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বিদেশে তাঁর এক টাকার বিনিয়োগের প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
এনসিপির পক্ষ থেকেও বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে দেখার অভিযোগ উঠেছে। নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, তার উৎস ও প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দলটি বিষয়টিকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে দেখছে বলে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে অন্যদিকে দুদকের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি বলেছে, অভিযোগ পাওয়া গেলেই তা সত্য বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে না; বরং অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। অর্থাৎ বর্তমানে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে যে অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটিকে আদালত বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে কারণ আসিফ মাহমুদকে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে এনসিপি। নাহিদ ইসলামই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রার্থিতার ঘোষণা দেন। এর পরপরই দুদকের অনুসন্ধান ও অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে অভিযোগের পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—দুদকের অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও গুরুতর আইনি পর্যায়ে যেতে পারে। আবার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা দাবিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
সুতরাং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে এবং দুদক তা অনুসন্ধান করছে—কিন্তু অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম ও এনসিপি যেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের কথা বলছে, সেখানে দুদক বলছে তারা অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করবে। ফলে সামনে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে এই বহুল আলোচিত অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু।
